উচ্চ রক্তচাপ: নীরব ঘাতককে চিনুন ও নিয়ন্ত্রণে রাখুন (High Blood Pressure: Identify the Silent Killer and Keep It Under Control)

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে বলা হয় "নীরব ঘাতক" (Silent Killer)। কারণ এই রোগে সাধারণত কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো - হার্ট, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখের মারাত্মক ক্ষতি করে। বাংলাদেশের প্রায় ২৫% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, এবং এর半数 জানেই না যে তাদের বিপি বেড়েছে। সঠিক জ্ঞান ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এই রোগকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

রক্তচাপ কী ও কেন বাড়ে?

রক্তচাপ হলো হৃদপিণ্ড থেকে রক্ত সঞ্চালনের সময় রক্তনালীর দেওয়ালে যে চাপ সৃষ্টি হয়। এটি দুটি সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয়:

  • সিস্টোলিক (উপরের সংখ্যা): হৃদপিণ্ড সংকুচিত হয়ে রক্ত পাম্প করার সময় চাপ।

  • ডায়াস্টোলিক (নিচের সংখ্যা): হৃদপিণ্ড শিথিল অবস্থায় রক্ত গ্রহণের সময় চাপ।

রক্তচাপের মাত্রা (Blood Pressure Categories)

ক্যাটাগরিসিস্টোলিক (উপরের)ডায়াস্টোলিক (নিচের)
স্বাভাবিক১২০ এর নিচেএবং৮০ এর নিচে
প্রি-হাইপারটেনশন১২০-১২৯এবং৮০ এর নিচে
উচ্চ রক্তচাপ (স্টেজ ১)১৩০-১৩৯বা৮০-৮৯
উচ্চ রক্তচাপ (স্টেজ ২)১৪০ বা তার বেশিবা৯০ বা তার বেশি
হাইপারটেনসিভ ক্রাইসিস১৮০ এর বেশিএবং/অথবা১২০ এর বেশি

উচ্চ রক্তচাপের কারণসমূহ

প্রাথমিক (Primary) বা অজানা কারণ:

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই (৯০-৯৫%) উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। এটি ধীরে ধীরে বছরের পর বছর ধরে বাড়তে থাকে।

সেকেন্ডারি (Secondary) বা নির্দিষ্ট কারণ:

অল্প কিছু ক্ষেত্রে (৫-১০%) নিচের কারণগুলোর জন্য উচ্চ রক্তচাপ হয়:

  • কিডনি রোগ।

  • থাইরয়েডের সমস্যা।

  • স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া)।

  • কিছু ওষুধ (জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ঠাণ্ডার ওষুধ, পেনকিলার)।

  • মদ্যপান ও ড্রাগস।

ঝুঁকি বাড়ায় যেসব বিষয় (Risk Factors):

অনিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি:

  • বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঝুঁকি বাড়ে (পুরুষে ৪৫+, মহিলায় ৬৫+)।

  • বংশগতি: পরিবারে কারো উচ্চ রক্তচাপ থাকলে।

  • লিঙ্গ: ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত পুরুষদের বেশি হয়, পরে মহিলাদের।

নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি:

  • অতিরিক্ত লবণ খাওয়া।

  • অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা।

  • ব্যায়াম না করা ও অলস জীবনযাপন।

  • ধূমপান ও মদ্যপান।

  • মানসিক চাপ।

  • অপর্যাপ্ত ঘুম।

  • পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়া।

  • অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া।

উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ (যখন দেখা দেয়)

উচ্চ রক্তচাপকে নীরব ঘাতক বলার কারণ অধিকাংশ সময় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। কিন্তু যখন রক্তচাপ অনেক বেড়ে যায় (মারাত্মক পর্যায়ে), তখন নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:

  • সকালে মাথাব্যথা (বিশেষ করে মাথার পেছনের দিকে)।

  • নাক দিয়ে রক্ত পড়া।

  • বুকে ধড়ফড় করা।

  • ঝিমঝিম করা ও মাথা ঘোরা।

  • দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া।

  • কানে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া (Tinnitus)।

  • ক্লান্তি ও বিভ্রান্তি।

উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা (চিকিৎসা না নিলে)

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ না করলে নিচের জটিলতাগুলো হতে পারে:

  1. হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক: রক্তনালী শক্ত ও সরু হয়ে গেলে ব্লকেজ হয়।

  2. হার্ট ফেইলিওর: অতিরিক্ত চাপে হার্ট দুর্বল হয়ে যায়।

  3. কিডনি ড্যামেজ: কিডনি অকেজো হয়ে যেতে পারে (ডায়ালাইসিস প্রয়োজন)।

  4. দৃষ্টিহীনতা: চোখের রেটিনার রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

  5. এনিউরিজম: রক্তনালী ফুলে গিয়ে ফেটে যেতে পারে।

  6. মেটাবলিক সিনড্রোম: ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়ে।

  7. স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া): মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল কমে যায়।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস (DASH ডায়েট)

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ডাক্তাররা সাধারণত DASH (Dietary Approaches to Stop Hypertension) ডায়েট ফলো করতে বলেন।

খাবেন যেসব খাবার (Do's)

১. পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার:
পটাশিয়াম সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব কমায় ও রক্তনালীর দেওয়াল শিথিল রাখে।

  • খাবেন: কলা, আলু (সিদ্ধ), মিষ্টি আলু, টমেটো, কমলা, পেয়ারা, ডাল, ছোলা, পাকা পেঁপে, শাকসবজি (পালংশাক)।

২. ম্যাগনেশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার:

  • খাবেন: বাদাম, আখরোট, কাঠবাদাম, ডাল, ছোলা, সবুজ শাকসবজি, কলা।

৩. ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার:

  • খাবেন: দুধ, টক দই, পনির, ছোট মাছ, সাদা তিল।

৪. আঁশযুক্ত খাবার (Fiber):

  • খাবেন: ওটস, লাল আটা, লাল চাল, সবজি, ফল।

৫. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড:

  • খাবেন: ইলিশ, সামুদ্রিক মাছ, অলিভ অয়েল, ফ্ল্যাক্স সিড।

বর্জনীয় বা সীমিত করবেন (Don'ts)

১. লবণ (সোডিয়াম) কমান:
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো লবণ।

  • দিনে ১ চা চামচের কম লবণ খান (প্রায় ৫-৬ গ্রাম)।

  • রান্নায় লবণ কমান, টেবিলে অতিরিক্ত লবণ খাবেন না।

  • প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন (চিপস, আচার, সস, টিনজাত খাবার, ফাস্ট ফুড)।

২. প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্ট ফুড বর্জন:

  • বার্গার, পিৎজা, সসেজ, নাগেটস, চিপস, বিস্কুট।

৩. চিনি ও মিষ্টি কমান:

  • কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি।

৪. ক্যাফেইন সীমিত করুন:

  • দিনে ১-২ কাপের বেশি চা-কফি খাবেন না। সন্ধ্যার পর চা-কফি এড়িয়ে চলুন।

৫. অ্যালকোহল ও ধূমপান বর্জন করুন।

জীবনযাত্রায় পরিবর্তন (Lifestyle Changes)

১. ওজন নিয়ন্ত্রণ (Weight Management)

শরীরের ওজন বাড়লে রক্তচাপও বাড়ে। মাত্র ৫-১০% ওজন কমালেও রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। BMI ১৮.৫-২৪.৯-এর মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন।

২. নিয়মিত ব্যায়াম (Regular Exercise)

সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪৫ মিনিট মাঝারি মানের অ্যারোবিক ব্যায়াম করুন।

  • দ্রুত হাঁটা, জগিং, সাঁতার, সাইক্লিং, যোগব্যায়াম।

  • নিয়মিত ব্যায়াম রক্তচাপ ৫-৮ mmHg কমাতে পারে।

৩. মানসিক চাপ কমানো (Stress Management)

দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ রক্তচাপ বাড়ায়।

  • প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট মেডিটেশন বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন।

  • পর্যাপ্ত ঘুমান (৭-৮ ঘণ্টা)।

  • শখের কাজ করুন, পরিবারের সাথে সময় কাটান।

৪. ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন

ধূমপান রক্তচাপ instant বাড়ায় ও রক্তনালী সংকুচিত করে। মদ্যপানও রক্তচাপ বাড়ায়।

৫. নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন

বাড়িতে একটি ভালো মানের BP মেশিন রাখুন এবং নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। সকালে ও সন্ধ্যায় একই সময়ে মাপার চেষ্টা করুন।

৬. পর্যাপ্ত ঘুম

প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ঘুমের অভাবে রক্তচাপ বাড়ে।

ঘরোয়া প্রতিকার (Home Remedies)

১. রসুন: সকালে খালি পেটে ১-২ কোয়া কাঁচা রসুন চিবিয়ে খান (রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে)।
২. লেবু-পানি: সকালে কুসুম গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে খান।
৩. তরমুজের বীজ: তরমুজের বীজ শুকিয়ে গুঁড়ো করে সকালে খালি পেটে পানির সাথে খান।
৪. পেঁয়াজের রস: ১ চামচ পেঁয়াজের রস ও ১ চামচ মধু মিশিয়ে খান।
৫. মেথি: রাতে মেথি ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে চিবিয়ে খান।
৬. আদা চা: প্রতিদিন সকালে আদা চা খান।

ওষুধ ও চিকিৎসা (Medication & Treatment)

উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তনে নিয়ন্ত্রণে আসে না, তখন ওষুধ খেতে হয়।

  • ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না বা বন্ধ করবেন না।

  • নিয়মিত ওষুধ সেবন করুন, মনে না থাকলে অ্যালার্ম সেট করুন।

  • রক্তচাপ স্বাভাবিক হলেও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না।

  • বছরে অন্তত একবার রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, ইসিজি করান।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

  • রক্তচাপ বারবার ১৪০/৯০-এর উপরে গেলে।

  • মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট হলে।

  • নিয়মিত ওষুধ খাওয়া সত্ত্বেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না এলে।

  • গর্ভবতী হলে ও রক্তচাপ বেড়ে গেলে।

  • হঠাৎ করে রক্তচাপ খুব বেড়ে গেলে (১৮০/১২০-এর বেশি) - জরুরি বিভাগে যান।

উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা

  • "মাথা ধরলে বুঝি বিপি বেড়েছে" - মাথা ধরার আগেই বিপি বেড়ে থাকতে পারে, আবার অনেক সময় বেড়েও মাথা ধরে না।

  • "ওষুধ খেলে কিডনি খারাপ হবে" - বরং ওষুধ না খেলে উচ্চ রক্তচাপই কিডনি খারাপ করে।

  • "বিপি স্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে দেব" - একবার শুরু করলে নিয়মিত খেতে হবে, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ করবেন না।

  • "লবণ কম খেলাম, এখন বিপি স্বাভাবিক" - শুধু লবণ কমালেই হবে না, পুরো জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে হবে।

উপসংহার

উচ্চ রক্তচাপ একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ কিন্তু এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, ওষুধের নিয়মিত সেবন এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চললে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। নিয়মিত চেকআপ ও সচেতনতাই পারে আপনাকে এই নীরব ঘাতক থেকে বাঁচাতে।

মনে রাখবেন: উচ্চ রক্তচাপকে ভয়ের নয়, নিয়ন্ত্রণের বিষয় হিসেবে দেখুন। আজকের ছোট ছোট সচেতন প্রচেষ্টাই আগামীর সুস্থ জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url