ডায়াবেটিস: নীরব মহামারীকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন (Diabetes: How to Control the Silent Epidemic)
ডায়াবেটিস একটি বিপাকীয় রোগ যা বর্তমানে সারা বিশ্বে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু বয়স্করা নয়, তরুণ ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ছে। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা একবার হলে পুরোপুরি সারে না, কিন্তু সঠিক যত্ন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর জটিলতা এড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। এটিকে তাই বলে "নীরব ঘাতক" কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন লক্ষণ প্রকাশ পায় না কিন্তু ধীরে ধীরে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
ডায়াবেটিস কী ও কেন হয়?
ডায়াবেটিস মূলত রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া। আমাদের খাওয়া খাবার থেকে উৎপন্ন গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে শক্তি জোগায়। কিন্তু ইনসুলিন নামক হরমোনের অভাবে বা অকার্যকারিতায় এই গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে পারে না এবং রক্তেই জমে থাকে।
ডায়াবেটিসের প্রকারভেদ
১. টাইপ ১ ডায়াবেটিস (ইনসুলিন-নির্ভর)
এটি সাধারণত শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের হয়।
অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করাই বন্ধ করে দেয়।
প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হয়।
এটি একটি অটোইমিউন রোগ।
২. টাইপ ২ ডায়াবেটিস (ইনসুলিন-প্রতিরোধী)
এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (৯০% রোগী)।
সাধারণত বয়স্ক, ওজনাধিক্য ও অনিয়মিত জীবনযাপনকারীদের হয়।
অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন তৈরি করলেও তা কার্যকরভাবে কাজ করে না।
খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes)
গর্ভাবস্থায় প্রথমবার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে।
সাধারণত প্রসবের পর সেরে যায়, কিন্তু পরবর্তীতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে যায়।
ডায়াবেটিসের সাধারণ লক্ষণ
ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন বোঝা যায় না। তাই সতর্ক থাকা জরুরি। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে রক্ত পরীক্ষা করান:
অতিরিক্ত পিপাসা লাগা (Polydipsia): ঘন ঘন তৃষ্ণা পাওয়া।
বারবার প্রস্রাব (Polyuria): বিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ওঠা।
ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া (Polyphagia): বেশি খাবার খাওয়ার পরও বারবার খিদে লাগা।
ওজন কমে যাওয়া: বেশি খাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমতে থাকা।
ক্লান্তি ও দুর্বলতা: সারাক্ষণ অবসাদ লাগা।
ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া: ছোট কাটাছেঁড়াও সহজে সারে না।
ঝিমঝিম ও দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া।
ঘন ঘন ইনফেকশন হওয়া।
ডায়াবেটিসের জটিলতা (দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব)
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে:
হৃদরোগ ও স্ট্রোক: রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কিডনি রোগ (নেফ্রোপ্যাথি): কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে।
স্নায়ুরোগ (নিউরোপ্যাথি): হাত-পায়ে জ্বালা-পোড়া, অবশভাব।
দৃষ্টিহীনতা (রেটিনোপ্যাথি): চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্ধত্ব হতে পারে।
পায়ের আলসার: সামান্য ক্ষত থেকেই পায়ে ঘা হয়ে তা পচে যেতে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস
খাবেন যেসব খাবার (Do's)
জটিল শর্করা (Complex Carbs):
লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত, ওটস, ভুট্টা।
এগুলো ধীরে হজম হয়, ফলে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যায় না।
আঁশযুক্ত খাবার (Fiber):
সবুজ শাকসবজি, লাউ, চালকুমড়া, ঝিঙে, উচ্ছে, করলা।
ডাল, ছোলা, মটরশুটি, বরবটি।
প্রোটিন:
মাছ (ইলিশ বাদে), মুরগির মাংস (চামড়া ছাড়া), ডিম, ডাল, টোফু, পনির।
প্রোটিন ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে ও পেশি গঠনে সাহায্য করে।
কিছু ফল:
জাম, পেয়ারা, আমড়া, আপেল, কমলা, নাশপাতি (মিষ্টি ফল যেমন আম, কাঁঠাল, লিচু পরিমিত খাবেন)।
ভালো চর্বি:
অলিভ অয়েল, সানফ্লাওয়ার অয়েল, বাদাম, আখরোট।
বর্জনীয় খাবার (Don'ts)
সরল শর্করা (Simple Carbs):
চিনি, গুড়, মধু, মিষ্টি জাতীয় খাবার।
সাদা চালের ভাত, ময়দার রুটি, পরোটা, পাউরুটি।
মিষ্টিজাতীয় পানীয়:
কোমল পানীয় (কোক, ফান্টা), প্যাকেটজাত জুস, এনার্জি ড্রিংকস্।
ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার:
বার্গার, পিৎজা, চিপস, সসেজ, কেক, পেস্ট্রি।
অতিরিক্ত তেল-মসলা ও ভাজাপোড়া।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন (Lifestyle Management)
১. নিয়মিত ব্যায়াম:
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো ব্যায়াম। এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং রক্তের গ্লুকোজ পেশিতে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।
সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা, জগিং, সাঁতার বা সাইক্লিং করুন।
যোগব্যায়াম ও হালকা ওজন তোলাও উপকারী।
২. ওজন নিয়ন্ত্রণ:
শরীরের অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের মেদ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। BMI স্বাভাবিক সীমায় রাখার চেষ্টা করুন।
৩. নিয়মিত ওষুধ সেবন ও পরীক্ষা:
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ বা ইনসুলিন নিন।
নিজের রক্তের শর্করা নিয়মিত বাড়িতে মাপুন।
HbA1c পরীক্ষা (গড় শর্করার মাত্রা) প্রতি ৩ মাসে একবার করান।
বছরে অন্তত একবার চোখ, কিডনি ও পায়ের পরীক্ষা করান।
৪. মানসিক চাপ কমানো:
স্ট্রেস রক্তের শর্করা বাড়ায়। মেডিটেশন, শখের কাজ, পরিবারের সাথে সময় কাটানো স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস প্রতিরোধের উপায়
ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ প্রতিরোধ না গেলেও, বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কিছু উপায় আছে:
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
সুষম খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা (চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া)।
নিয়মিত ব্যায়াম করা।
ধূমপান ও মদ্যপান না করা।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
পায়ের যত্ন (Foot Care)
ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের যত্ন বিশেষভাবে জরুরি। স্নায়ুর সমস্যার কারণে পায়ে ব্যথা বা ক্ষত বোঝা যায় না, ফলে ছোট ক্ষত থেকেই বড় সমস্যা হতে পারে।
প্রতিদিন পা ধুয়ে ভালোভাবে দেখুন (কোথাও ফোসকা, কাটা বা লালভাব আছে কিনা)।
পা ভিজে থাকলে নরম কাপড় দিয়ে মুছে ফেলুন, বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকা অংশ।
আরামদায়ক জুতা ও মোজা পরুন।
খালি পায়ে চলবেন না।
নখ কাটার সময় সাবধান থাকুন।
উপসংহার
ডায়াবেটিস কোনো অভিশাপ নয়, এটি একটি ক্রনিক কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য অবস্থা। সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা, শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়াবেটিসকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব। নিজের যত্ন নিন, পরিবারের অন্যদেরও সচেতন করুন।
মনে রাখবেন: ডায়াবেটিস আপনার জীবনকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি আপনি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে জানেন।

