থাইরয়েড: নীরব ঘাতককে চিনুন ও সুস্থ থাকুন (Thyroid: Identify the Silent Killer and Stay Healthy)


থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের গলার সামনের দিকে অবস্থিত একটি ছোট্ট, প্রজাপতি আকৃতির গ্রন্থি। এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন (T3 ও T4) আমাদের শরীরের তাপমাত্রা, হৃদস্পন্দন, ওজন ও শক্তির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু যখন এই গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ করে না, তখন তৈরি হয় নানা জটিলতা। শহুরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে থাইরয়েডের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যাকে অনেক সময় 'নীরব ঘাতক' বলা হয়।

থাইরয়েডের প্রকারভেদ

থাইরয়েড মূলত দুই ধরনের সমস্যা তৈরি করে:

১. হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism) - থাইরয়েডের অকার্যকারিতা

এই অবস্থায় থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে কম হরমোন নিঃসৃত হয়, ফলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।

  • লক্ষণ:

    • ওজন বেড়ে যাওয়া (কম খেয়েও ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়ে)।

    • ক্লান্তি ও দুর্বলতা (সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব)।

    • কোষ্ঠকাঠিন্য (Constipation)।

    • ত্বক ও চুল শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং চুল পড়া।

    • ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পারা।

    • মনোযোগ কমে যাওয়া ও বিষণ্নতা।

২. হাইপারথাইরয়েডিজম (Hyperthyroidism) - থাইরয়েডের অতিরিক্ত সক্রিয়তা

এই অবস্থায় থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় হরমোন নিঃসৃত হয়, ফলে বিপাকক্রিয়া অতিরিক্ত বেড়ে যায়।

  • লক্ষণ:

    • খিদে বেড়ে গেলেও ওজন কমতে থাকে।

    • হাত-পা কাঁপা (ট্রেমর)।

    • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া ও গরম সহ্য করতে না পারা।

    • ঘুম কমে যাওয়া ও উদ্বেগ (Anxiety)।

    • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া (Palpitations)।

    • চোখ ফুলে ওঠা (Graves' disease-এর ক্ষেত্রে)।


থাইরয়েড হওয়ার কারণসমূহ

  • অটোইমিউন ডিজিজ: হাশিমোটো থাইরয়েডাইটিস (হাইপোর জন্য) এবং গ্রেভস ডিজিজ (হাইপারের জন্য)।

  • আয়োডিনের ঘাটতি বা আধিক্য: আয়োডিন থাইরয়েড হরমোনের প্রধান উপাদান।

  • মানসিক চাপ: দীর্ঘমেয়াদী স্ট্রেস হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে।

  • বংশগতি: পরিবারে কারো থাইরয়েড থাকলে ঝুঁকি বেশি।

  • গর্ভাবস্থা ও প্রসবোত্তর সময়।

  • অনিয়মিত জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস।

খাদ্যাভ্যাস: থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে যা খাবেন আর যা খাবেন না

খাবেন যেসব খাবার (Do's)

হাইপোথাইরয়েডিজমের জন্য:

  • সেলেনিয়াম: ব্রাজিল নাট, ডিম, সূর্যমুখীর বীজ (থাইরয়েড হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে)।

  • জিঙ্ক: চিংড়ি, গরুর মাংস, ডাল, বাদাম।

  • আয়োডিন: আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত খাবার (পরিমিত)।

  • ভিটামিন বি১২ ও আয়রন: শাক-সবজি, কলিজা, ডিম।

হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য:

  • ক্রুসিফেরাস সবজি: ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি (এগুলো প্রাকৃতিকভাবে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন কিছুটা কমাতে সাহায্য করে)।

  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার: বেরি জাতীয় ফল, টমেটো, বেলপেপার।

  • ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি: হাড়ের সুরক্ষায় দুধ, দই, পনির।

বর্জনীয় খাবার (Don'ts)

  • প্রক্রিয়াজাত খাবার: প্যাকেটজাত চিপস, ফাস্ট ফুড, সফট ড্রিংকস।

  • সয়া প্রোডাক্টের আধিক্য: টোফু, সয়া মিল্ক (অতিরিক্ত খেলে থাইরয়েড ওষুধের শোষণ ক্ষমতা কমে)।

  • গ্লুটেন: অনেক থাইরয়েড রোগীর গ্লুটেন সংবেদনশীলতা থাকে (গম, যব)।

  • অতিরিক্ত ক্যাফেইন: কফি থাইরয়েড ওষুধের সাথে সাথে খেলে ওষুধ কাজ করে না (অন্তত ১ ঘণ্টার ব্যবধান রাখুন)।


জীবনযাত্রায় পরিবর্তন (Lifestyle Changes)

  1. নিয়মিত ব্যায়াম: যোগব্যায়াম ও হালকা কার্ডিও থাইরয়েডের কার্যকারিতা বাড়ায়। হাইপোথাইরয়েড রোগীদের জন্য এটি বিশেষভাবে জরুরি।

  2. পর্যাপ্ত ঘুম: দিনে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম হরমোন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

  3. মানসিক চাপ কমানো: মেডিটেশন, প্রার্থনা, পরিবারের সাথে সময় কাটানো স্ট্রেস কমায়।

  4. ওষুধ সেবনে নিয়মিততা: হাইপোথাইরয়েডিজম সাধারণত Life Long রোগ, তাই প্রতিদিন খালি পেটে থাইরক্সিন (Thyroxine) খাওয়া জরুরি।

  5. নিয়মিত চেকআপ: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি ৬ মাস বা ১ বছর পর পর TSH পরীক্ষা করানো উচিত।

প্রতিরোধ ও সতর্কতা

  • বয়স ৩০ পেরোলেই নারী-পুরুষ উভয়েরই থাইরয়েড পরীক্ষা করা উচিত, বিশেষ করে যদি পরিবারে কারো থাকে।

  • ওজন হঠাৎ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়াকে কখনোই স্বাভাবিক মনে করবেন না।

  • ক্লান্তি ও অবসাদ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

  • গর্ভধারণের পরিকল্পনা করলে আগে থাইরয়েড পরীক্ষা করিয়ে নিন, কারণ এটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব ফেলে।

উপসংহার

থাইরয়েড এমন একটি রোগ যা একবার ধরা পড়লে সম্পূর্ণ সেরে যায় না, কিন্তু সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাই থাইরয়েডের লক্ষণগুলো জানুন, সচেতন হোন এবং সুস্থ থাকুন।

মনে রাখবেন: আপনি একা নন, সঠিক যত্ন ও সচেতনতাই পারে আপনাকে সুস্থ ও সক্রিয় রাখতে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url