হৃদরোগের ঝুঁকি কমাবে যেসব জীবনশৈলী (Lifestyle Changes That Will Reduce Your Heart Disease Risk)
একটি সুস্থ হৃদয়ের জন্য সম্পূর্ণ জীবনযাপন গাইড
হৃদপিণ্ড আমাদের শরীরের সবচেয়ে পরিশ্রমী অঙ্গ। এটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,০০,০০০ বার স্পন্দিত হয়ে সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করে। এই নিরলস কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তার সঠিক যত্ন নেওয়া আমাদের কর্তব্য। শুধু কোনো একটি বিষয়ে মনোযোগ দিলেই হবে না, বরং জীবনযাপনের সামগ্রিক পরিবর্তন আনতে হবে।
১. খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন: আপনার পাতে রাখুন যা হার্ট চায়
খাবারই আমাদের জ্বালানি। সঠিক জ্বালানি হার্টকে সচল রাখে, আর ভুল জ্বালানি তাকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে।
লবণ ও চিনির নিয়ন্ত্রণ:
লবণ (সোডিয়াম): অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানি আটকে রাখে, ফলে রক্তের পরিমাণ বেড়ে রক্তচাপ বেড়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের প্রধান কারণ। রান্নায় লবণ কমান, এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার (চিপস, আচার, সস, টিনজাত খাবার) এড়িয়ে চলুন।
চিনি: অতিরিক্ত চিনি ওজন বাড়ায় এবং রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড (এক ধরনের চর্বি) বাড়িয়ে দেয়। মিষ্টিজাতীয় পানীয়, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, কেক-পেস্ট্রি পরিহার করুন।
হৃদবান্ধব চর্বি চিনে নিন:
ভালো চর্বি (Unsaturated Fats): অলিভ অয়েল, সানফ্লাওয়ার অয়েল, বাদাম, আখরোট, চিয়া সিড, এবং অ্যাভোকাডোতে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করে।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: ইলিশ, স্যামন, টুনা জাতীয় সামুদ্রিক মাছ ওমেগা-৩-এর চমৎকার উৎস। এটি রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড কমায়, রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন।
খারাপ চর্বি বর্জন করুন:
ট্রান্স ফ্যাট: এটি হার্টের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। ডালডা দিয়ে তৈরি যে কোনো খাবার (পরোটা, বিস্কুট, পেস্ট্রি, ফাস্ট ফুড) এবং হাইড্রোজেনেটেড উদ্ভিজ্জ তেল যুক্ত প্যাকেটজাত খাবার (চিপস, ক্র্যাকার) সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট: লাল মাংস, মাখন, ঘি, চিজ ইত্যাদি সীমিত পরিমাণে খেতে হবে।
আঁশযুক্ত খাবার (ফাইবার) বাড়ান:
দ্রবণীয় আঁশ (Soluble Fiber) রক্তে কোলেস্টেরল শোষণ কমাতে কার্যকর। ওটস, যব, ডাল, মসুর, বিনস, আপেল ও গাজরে প্রচুর দ্রবণীয় আঁশ থাকে।
লাল আটা, লাল চাল, সবুজ শাকসবজি এবং বীজ জাতীয় খাবার খেলে হজম ভালো হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২. নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীরচর্চা: অলসতা ত্যাগ করুন
শরীরকে গতিশীল রাখা হার্টের জন্য জরুরি। ব্যায়াম হার্টের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং রক্ত চলাচল উন্নত করে।
কার্ডিও ব্যায়াম: দ্রুত হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার কাটা বা রোপ স্কিপিং-এর মতো অ্যারোবিক ব্যায়াম হার্টের জন্য সবচেয়ে ভালো। এতে হার্টের ধারণক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা বাড়ে। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০-৪৫ মিনিট ব্যায়ামের চেষ্টা করুন। একটানা না পারলেও ১০ মিনিটের ব্যবধানে তিনবার করলেও হবে।
সহজ মুভমেন্ট: দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করবেন না। প্রতি ঘণ্টায় ৫ মিনিটের জন্য উঠে হাঁটাহাঁটি করুন। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। ছোট এই পরিবর্তনগুলোই বড় প্রভাব ফেলে।
৩. ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ: নিজেকে বাঁচান
ধূমপান ও তামাক বর্জন: ধূমপান হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ। তামাকের রাসায়নিক পদার্থ রক্তনালির ভেতরের দেওয়ালে আঘাত করে, সেখানে চর্বি জমতে সাহায্য করে, ফলে ধমনি সরু হয়ে যায় ও রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। এছাড়া এটি রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্তই হার্টের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে।
মদ্যপান এড়িয়ে চলা: অতিরিক্ত মদ্যপান রক্তচাপ বাড়ায় এবং হার্টের পেশি দুর্বল করে দিতে পারে (কার্ডিওমায়োপ্যাথি)।
৪. মন ও শরীরের বিশ্রাম: মানসিক স্বাস্থ্য এবং পর্যাপ্ত ঘুম
পর্যাপ্ত ও গুণগত ঘুম: ঘুমের সময় শরীর নিজেকে মেরামত করে, রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন কমে যায়, ফলে হার্ট বিশ্রাম পায়। নিয়মিত ৭-৮ ঘণ্টার গভীর ঘুম হার্টের জন্য অপরিহার্য।
মানসিক প্রশান্তি (স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট): দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও রাগের কারণে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। এটি হার্টের ওপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করে।
স্ট্রেস কমাতে নিয়মিত যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন করতে পারেন।
পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটান।
আপনার পছন্দের শখের কাজ (গান শোনা, বই পড়া, বাগান করা) করার জন্য সময় বের করুন।
৫. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ: সচেতন থাকুন
নিয়মিত চেকআপ: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো সমস্যাগুলো প্রায়ই নীরবে শরীরের ক্ষতি করে। তাই লক্ষণ প্রকাশের আগেই এগুলো শনাক্ত করতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি।
ব্লাড প্রেশার: নিয়মিত মাপুন। এটি ১২০/৮০-এর নিচে রাখার চেষ্টা করুন।
ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ডায়াবেটিস থাকলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
কোলেস্টেরল: বছরে অন্তত একবার 'লিপিড প্রোফাইল' টেস্ট করিয়ে রক্তে ভালো (HDL) ও খারাপ (LDL) কোলেস্টেরলের মাত্রা জানুন।
সঠিক ওজন বজায় রাখা: পেটের স্থূলতা (পেটের মেদ) হার্টের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। শরীরের ওজন বডি মাস ইনডেক্স (BMI)-এর স্বাভাবিক সীমার (১৮.৫ - ২৪.৯) মধ্যে রাখুন। কোমরের মাপ পুরুষদের ক্ষেত্রে ৯০ সেন্টিমিটার (৩৬ ইঞ্চি) এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৮০ সেন্টিমিটার (৩২ ইঞ্চি) এর নিচে রাখা ভালো।
ব্যক্তিগতকৃত পরামর্শ
আপনি যদি আপনার বর্তমান বয়স, ওজন, উচ্চতা, এবং আগে থেকে চিহ্নিত কোনো শারীরিক সমস্যা (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড ইত্যাদি) এবং বর্তমানে নিয়মিত সেবন করেন এমন কোনো ওষুধের নাম জানান, তাহলে আপনার জন্য আরও নির্দিষ্ট ও কার্যকরী খাদ্য তালিকা ও ব্যায়ামের রুটিন সুপারিশ করতে পারব। উদাহরণস্বরূপ, ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের নিয়ম উচ্চ রক্তচাপের রোগীর থেকে কিছুটা ভিন্ন হবে।
মনে রাখবেন, হৃদরোগ থেকে সুরক্ষার জন্য আজকের ছোট ছোট সচেতন প্রচেষ্টাই আগামীর সুস্থ ও সক্রিয় জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
